মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

জেলার ঐতিহ্য

 

মানিকগঞ্জের ঐতিহ্য

সহনশীলতা-সম্প্রীতির ঐতিহ্যঃ

বর্তমান মানিকগঞ্জের মানুষ তার পূর্বপুরুষদের চেতনার যোগ্যতর উত্তরাধিকার। এ মাটিতে কালে কালে যুগে যুগে জন্ম নেয়া মহান পুরুষেরা তাঁদের চেতনা এবং সংস্কৃতিতে রেখে গিয়েছিলেন ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির চেতনা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সহমর্মিতা নিয়ে বসবাস ও জীবন ধারণের যে প্রথা তাঁরা প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন সময়ের বিবর্তনে তা ঐতিহ্য হিসেবে বয়ে চলেছেন এ প্রজন্মের মানুষ। এ অঞ্চলের হিন্দু ও মুসলমান বৈঞ্চব এবং সুফী দর্শনে উজ্জীবিত হয়ে তাঁদের চেতনায় ধারণ করেছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং অহিংসার বিশ্বাস। গ্রামে-গ্রামে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, পবিবারে-পরিবারে নৃশংসতাও দৃশ্যতঃ এখানে খুব একটা চোখে পড়ে না। সূদুর অতীত থেকে বর্তমান  একই ধারায় বহমান। ঐতিহ্যের এ গৌরব সব জনপদের মানুষের থাকে না।

বিদ্রোহ-বিপ্ল­ব,লড়াই -সংগ্রামের ঐতিহ্যঃ

এ জনপদের শান্ত মানুষেরা বৃটিশ বেনিয়াদের বর্বর নীল চাষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। নীলকর সাহেবেরা পালিয়েছিলেন কুঠি ফেলে। স্বদেশী আন্দোলনের সময় সরকারী ডাক লুটের মত দুঃসাহসের ঘটনা ঘটেছিল মানিকগঞ্জ শহরেই। ওহাবী এবং ফরায়েজী আন্দোলনেও উত্তাল ছিল এ জনপদ। উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থানে বুকে বুলেট ধারণ করতে দ্বিধা করেননি শহীদ এসহাক। ৫২’র মহান ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদের মর্যাদা ছিনিয়ে এনেছিলেন ভাষা শহীদ রফিক। ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে সৃষ্টি করেছেন বীরত্ব আর আত্মত্যাগের অসামান্য নজীর। বীরত্বের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, মর্যাদাপূর্ণ বীরউত্তম, বীর প্রতীক খেতাব প্রাপ্তির দিক থেকেও পিছিয়ে নেই মানিকগঞ্জ। শুধু তাই নয় হরিরামপুরের ডাকের চরা দুর্গে মোগল-বার ভূঁইয়াদের লড়াইয়ের ইতিহাসও আছে। এই যে সংগ্রামী চেতনা তা এক হৃদয় থেকে অন্য হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়েছে, অর্জিত হয়েছে বংশ পরম্পরায় । চেতনা এবং বোধের গভীরে থাকা সুপ্ত শক্তিতে তা আজও ধারণ করে আছে মানিকগঞ্জ।

আধ্যাত্মবাদের ঐতিহ্যঃ

জেলার নামকরণ প্রসঙ্গ আসলেই সবচেয়ে বড় হয়ে আসে আধ্যাত্ম সাধনায় সিদ্ধ  পুরুষ মানিক সাধুর নাম। যে জেলার নামের সাথে জড়িয়ে আছে এ আধ্যাত্মিক ব্যক্তির নাম সে জেলার মানুষের মনোজগতে আধ্যাত্মিকতার ঐতিহ্য লালিত হওয়াই স্বাভাবিক। এ জনপদের সমাজ ও ধর্মের বিকাশ লগ্নে জড়িয়ে আছে অসংখ্য সুফী সাধক, দরবেশ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব,সাধু সন্ন্যাসীর স্মৃতি, তাঁদের প্রেরণা,বাণী, কর্ম ও আদর্শ। মুসলিম বিজয়ের পূর্বে মানিকগঞ্জ জেলা  পর্যায়ক্রমে ইতিহাস বিখ্যাত পাল, চন্দ্র, বর্মন এবং সেন বংশীয় রাজাদের শাসনাধীনে কাটিয়েছে। সমাজ ব্যবস্থায় ছিল তাদের সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রভাব। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলে মুসলিম রাজনৈতিক শক্তি ও শাসন স্থায়ী হয়। এরপরই মানিকগঞ্জ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে আসেন সুফী সাধক, দরবেশ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বগণ। অনেকেই এ মাটিতে তাঁদের পবিত্র দেহ রেখে মানিকগঞ্জকে ধন্য করেছেন। মানিকগঞ্জ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে এসেছিলেন হযরত শাহ সুলতান বলখী। হযরত সুফী সাধক হযরত গাজী মুলক ইকরাম খান (মানিকগঞ্জের সিংগাইরের পারিলে তাকে সমাহিত করা হয়েছে। মুসলিম বাংলা সাহিত্য, ড.এনামুল হক), অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে খ্যাত হযরত শাহ রুস্তম (হরিরামপুরের মাচাইনে তার মাজার রয়েছে), সাধক হযরত দানেস্তা শাহ (হরিরামপুরের দানেস্তাপুর তার নামেই সুপরিচিত), হযরত হায়দার শেখ (হরিরামপুরের ইলিচপুরে তাঁর  দরগাহ অবস্থিত), সৈয়দ সোলায়মান বোখারী (যাত্রাপুরে তাঁর মাজার রয়েছে), শাহ মুখদুম রুপস, সৈয়দ এনায়েত শাহ, হযরত রসুল শাহ্ (বরুন্ডী গ্রামে খানকা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন) হযরত শাহ সৈয়দ মতিউল­াহ প্রমুখ। এঁরা সবাই ছিলেন সুফী তত্ত্বে বিশ্বাসী মানুষ। এঁরা ছাড়াও মানিকগঞ্জে রয়েছে আফাজ পাগলা, কালুশাহ, মফিজ শাহ্’র মত আধ্যাত্মিক সাধকদের মাজার। এঁদের আদর্শ ও চেতনা অহিংস মানবতাবাদী দর্শন ও বাণী এ অঞ্চলের মানুষের মনোভূমিকে করেছে সহনশীল উদার। এ জেলায় পদধুলি দিয়েছিলেন শ্রী চৈতন্য দেবের মত মহাপুরুষেরা, এসেছিলেন পূর্ণচন্দ্র বাউল। এঁরা আধ্যাত্মবাদের যে মশাল জ্বেলেছিলেন তা আজও বিমোহিত করে রেখেছে মানিকগঞ্জের জনপদকে। আর তাই জেলার বিভিন্ন মাজার দরগায় ভীড় জমে লাখো মানুষের। মাজার দরগাহ্র প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তির এ ধারা মানিকগঞ্জের মানুষেরা বয়ে বেড়াচ্ছেন পরম বিশ্বাসে, যা বহু আগেই আসন গেড়েছে ঐতিহ্যের ঘরে।

লোক সঙ্গীতের ঐতিহ্যঃ

মানিকগঞ্জের মানুষের রক্তের প্রতিটি অনু পরমানুতে বয়ে চলেছে লোক সংগীতের সুরধারা। মানিকগঞ্জ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ জনপদ কখনও ছিলনা, কিন্তু অভাবের তীব্রতায় বিধ্বঃস্ত হয়নি কখনোই। কৃষি নির্ভর নিস্তরঙ্গ জীবনধারা ও সুফী বৈঞ্চব দর্শণের প্রভাবে এ জনপদের মানুষেরা বরাবরই জীবাত্মা-পরমাত্মা, স্রষ্টা-সৃষ্টির সম্পর্ক খুঁজে বেড়িয়েছে। সন্ধান করেছে পরমাত্মা, স্রষ্টার। আর এ চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে মানিকগঞ্জের লোক সংগীতে। আর তা ধারন করেছেন লোকগীতিকাররাও। ‘‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, কত রব আমি পন্থের পানে চাইয়ারে’’ এমন জীবন যন্ত্রনার সুরের পরিবর্তে  মানিকগঞ্জের  গানে বরাবরই মূর্ত হয়েছে ‘‘নিরিখ বান্ধোরে দুই নয়নে’’র মত আধ্যাত্মিকতার সুর। আর এ সুরধারায় আপ­ুত,স্নাত হয়েছেন  সাধারণ মানুষ। মানিকগঞ্জের সঙ্গীতের এ ঐতিহ্য আজও বয়ে চলেছেন সাধরণ মানুষ। এখনো জারি, সারি বিচার, কবি, মুর্শীদি ও মারফতী গানের আসরে বাঁধভাঙা জোয়ারের মত ঢল নামে মানুষের। রাতের পর রাত জেগে মন্ত্রমুগ্ধের মত প্রাণের তরঙ্গে মিশিয়ে নেয় ঐতিহ্যের সুরধারা।

যাত্রাপালা,মেলা,অতিথি আপ্যায়ন-পিঠাপুলি, নৌকা বাইচের ঐতিহ্যঃ 

শত শত বছর ধরে গ্রাম-জনপদ মাতিয়েছে পালাগান এবং যাত্রা। দেশখ্যাত অসংখ্য যাত্রাদলের জন্মও হয়েছে মানিকগঞ্জে। আজও যাত্রার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে মানিকগঞ্জের মানুষ; গর্বও করে এ নিয়ে।

মানিকগঞ্জের অনন্য ঐতিহ্য তার গ্রামীন মেলা। মেলার জেলা বললেও অত্যুক্তি হয় না। নানা উপলক্ষে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসতো অসংখ্য মেলা। কোনটি একদিনের কোনটি চলতো মাসব্যাপি। এ মেলার প্রচলন এ জনপদের পূর্বপুরুষদের সৃজনশীল ভাবনা আর উদ্যোগের ফসল, প্রশান্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি। কৃষি ভিত্তিক জীবন প্রবাহে  বিনোদন আর বাণিজ্যের মিলন। ‘অসংখ্য মেলায় উৎসব মুখর মানিকগঞ্জ’ এমন জীবন্ত ছবি শতবর্ষ আগেও ছিল। এ সংখ্যা কিছুটা কমলেও মানিকগঞ্জের মেলার উৎসব মুখরতা আজো আছে। কালপ্রবাহের সাথে পরম্পরার দায় কাঁধে নিয়ে এখনও মিলছে মেলা, হাজারও মানুষের প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত।  

খাল, বিল, নদীর জেলা মানিকগঞ্জ। এ জেলার মানুষের সার্বজনীন বিনোদন এবং উৎসবের অন্যতম ঐতিহ্য নৌকাবাইচ। কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, হেলাচিয়া এবং খোদ জেলা শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালে বিভিন্ন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হত নৌকাবাইচ। ধনী- দরিদ্র, জমিদার-প্রজা, হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে লাখো মানুষের মাঝে বয়ে যেত সার্বজনীন আনন্দধারা। নৌকা বাইচের শতবর্ষের অয়োজন আজও ম­ান হয়নি একটুও। বর্ষায় ভরা জলের গন্ধে  মানুষের রক্তে নাচন লাগে, জমে উঠে বাইচ।

ধর্মীয় উৎসব ,ঐতিহ্যে ভিন্নমাত্রাঃ 

হিন্দু-মুসলমান মিলেমিশে উপভোগ করবার মত ঐতিহ্য মিশে আছে ধর্মীয় উৎসবেও। শতবর্ষ ধরে মানিকগঞ্জে পালিত হয় শোকাবহ মুহর্রম। আশুরার দিন শহরে বের হয় একাধিক বিশাল তাজিয়া মিছিল। ধর্মীয় আমেজ পেরিয়ে তাজিয়া মিছিল দেখার জন্য লাখো মানুষের ঢল নামে মানিকগঞ্জে। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সবাই অপেক্ষা করে এ দিনটির জন্য। পূর্ব পুরুষেরা তাজিয়া মিছিলের যে রীতি চালু করেছিলেন তার লোক প্রিয়তায় একবিন্দু ঘাটতি পড়েনি, উদ্যমও হারায়নি উদ্যোক্তারা। তারা ধরে রেখেছেন পূর্ব পুরুষের এ প্রচেষ্টাকে। হিমদু সম্প্রদায়ে রথযাত্রা উৎসব মানিকগঞ্জের অনেক স্থানে অত্যন্ত আড়ম্বরে উদ্যাপিত হয়। এ উপলক্ষে বসে মেলা। মেলা এবং রথযাত্রায় যেমন সমবেত হয় হাজার হাজার পূর্ণার্থী, তেমনি সমাবেশ ঘটে ভিন্ন  ধর্মের মানুষেরও। আনন্দ আহরণে থাকেনা কোন ভেদ রেখা। সরস্বতী প্রতিমার শোভাযাত্রা । দেশের প্রায় সর্বত্রই পালিত হয় সরস্বতী পূজা; কিন্তু এ প্রতিমার শোভাযাত্রায় বিশাল আড়ম্বর অন্যত্র বিরল। আলোকমালায় সজ্জিত প্রতিমাকে নিয়ে রাতের আঁধারে কাঁসার ঘণ্টা আর ঢাকের উন্মাতাল ধ্বনি  মুখরিত করে মানিকগঞ্জের শহর শহরতলী। শত শত প্রতিমার শোভা যাত্রা দেখবার জন্য শহরে থাকে না তিল ধারণের ঠাঁই; দর্শক সারিতে ভেদাভেদ থাকেনা হিন্দু কিংবা মুসলমানের ।

হাজারী গুড়ের ঐতিহ্যঃ

মানিকগঞ্জের হাজারী গুড়ের খ্যাতি হাজার বছরের। সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র মানিকগঞ্জেই তৈরী হয় এই ইতিহাস প্রসিদ্ধ হাজারী  গুড়। গাছের রস থেকে বিশেষ কৌশলে সুগন্ধময় স্বাদ সফেদ এ গুড়ের উদ্ভাবন করেছিলেন হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা  গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন হাজারী। প্রকৃত হাজারী গুড় তৈরীর গোপন কৌশল একমাত্র তার পরিবারের সদস্যদের মাঝেই রয়ে গেছে। আজও এ গুড় নিয়ে মানিকগঞ্জবাসীর অহংয়ের কমতি নেই। তাঁর পরিবার এবং এলাকার কারিগররা টিকিয়ে রেখেছেন হাজারী গুড়। সাধারণ মানুষও ভুলেনি এর স্বাদ ।